মাত্র ১৮ দিনেই দেশে এল ১৯৭ কোটি ডলার, রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে নতুন মাইলফলক

চলতি এপ্রিল মাসের প্রথম ১৮ দিনেই প্রবাসী আয়ে বড় ধরনের চমক দেখেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য বলছে, এই অল্প সময়ে দেশে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে ১৯৭ কোটি ডলারের বেশি। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১১ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের এই কঠিন সময়ে প্রবাসীদের এই উপহার দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রবাসী আয়ের এই ধারা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি। গত বছর এই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা ধীর গতির থাকলেও, এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিন গড়ে ১১ কোটি ডলার করে আসা মানে হলো, এই প্রবাহ যদি মাসের বাকি দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকে, তবে মাস শেষে রেমিট্যান্স আহরণ অনায়াসেই ৩০০ কোটি বা ৩ বিলিয়ন ডলারের জাদুকরী সংখ্যা ছুঁতে পারে, যা বিগত কয়েক বছরের ইতিহাসে একটি নতুন রেকর্ড তৈরি করবে।
হঠাৎ করে রেমিট্যান্সের এই উল্লম্ফনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা। প্রথমত, সদ্য সমাপ্ত ঈদুল ফিতর এবং পহেলা বৈশাখ—এই দুটি বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের অভ্যন্তরে থাকা পরিবার-পরিজনদের বাড়তি খরচের জোগান দিতে প্রবাসীরা উদারহস্তে টাকা পাঠিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের নানামুখী কাঠামোগত পদক্ষেপ। ব্যাংকগুলোতে এখন ডলারের বিনিময় হার আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবসম্মত করা হয়েছে। এর পাশাপাশি সরকারের দেওয়া নগদ প্রণোদনা প্রবাসীদের বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে দারুণভাবে উৎসাহিত করছে।
দীর্ঘদিন ধরে হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেল দেশের রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ গিলে খাচ্ছিল। কিন্তু সম্প্রতি হুন্ডি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি, নজরদারি বৃদ্ধি এবং অবৈধ লেনদেনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় এর সুফল মিলতে শুরু করেছে। হুন্ডির চেয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানো এখন অনেক বেশি নিরাপদ এবং লাভজনক—এই উপলব্ধি প্রবাসীদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
আরও পড়ুনঃ পরবাসে নিজের ভাষায় বাংলাদেশি ডাক্তার ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সহজ পথ
শুধু সামষ্টিক অর্থনীতিই নয়, তৃণমূল পর্যায়েও এই রেমিট্যান্সের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। বর্তমান বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ প্রান্তিক পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে বড় ধরনের ঢাল হিসেবে কাজ করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থ সরবরাহ বাড়ায়। ফলে স্থানীয় বাজারগুলোতে চাহিদা তৈরি হয়, যা পরোক্ষভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।
তবে এই সাময়িক স্বস্তিতে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই বলে মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রেমিট্যান্সের এই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির দিকে সরকারকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে, যাতে একই সংখ্যক কর্মী থেকে কয়েকগুণ বেশি আয় করা সম্ভব হয়।











