আইইএলটিএস ছাড়া ইউরোপে পড়াশোনা: সোনালী সুযোগ নাকি কেবলই মরিচিকা?

উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে ইউরোপের সেনজেনভুক্ত দেশগুলোর আকর্ষণ দিন দিন বাড়ছে। তবে ইউরোপের শীর্ষ সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবেদনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইংরেজি ভাষার দক্ষতা প্রমাণের পরীক্ষা আইইএলটিএস (IELTS)। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এজেন্সি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে যে, আইইএলটিএস ছাড়া ইউরোপে পড়াশোনা করার ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। এই প্রচারণার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা আসল বাস্তবতা এবং সঠিক নিয়ম কানুন নিয়েই আমাদের আজকের এই বিশেষ অনুসন্ধান।
ইউরোপের অনেক দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য আইইএলটিএসের বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছে। যদি কোনো শিক্ষার্থীর স্নাতক বা পূর্ববর্তী শিক্ষার মাধ্যম সম্পূর্ণ ইংরেজিতে হয়ে থাকে, তবে প্রতিষ্ঠান থেকে একটি সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। একে বলা হয় ‘মিডিয়াম অব ইনস্ট্রাকশন’ বা এমওই (MOI)। আইইএলটিএস ছাড়া ইউরোপে পড়াশোনা এর ক্ষেত্রে এই সনদটিই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে ইতালির বেশ কিছু প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় এই সনদের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের সরাসরি ভর্তির সুযোগ দিচ্ছে।
জার্মানি, ফ্রান্স ও চেক প্রজাতন্ত্রের মতো দেশগুলোতে অনেক পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যারা আইইএলটিএস ছাড়া আবেদন গ্রহণ করে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, সব কোর্সের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। সাধারণত বিজনেস, আইটি বা কিছু নির্দিষ্ট হিউম্যানিটিজ কোর্সে এই ছাড় পাওয়া যায়। অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অফার লেটার দেওয়ার আগে অনলাইনে বা স্কাইপে একটি ছোট ইন্টারভিউ নিয়ে শিক্ষার্থীর ইংরেজি বলার দক্ষতা যাচাই করে নেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যাডমিশন লেটার বা অফার লেটার পেয়ে যাওয়া মানেই কিন্তু শতভাগ নিশ্চিত ভিসা নয়। সেনজেন দেশগুলোর দূতাবাসগুলো ভিসা ইস্যু করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর নিয়মনীতি অনুসরণ করে। অনেক শিক্ষার্থী এমওই সার্টিফিকেট দিয়ে খুব সহজেই ইউনিভার্সিটির আইইএলটিএস ওয়েভার (ছাড়) পেয়ে যান। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয় যখন তারা ভিসার জন্য দূতাবাসে মুখোমুখি সাক্ষাৎকারে দাঁড়ান। সেখানে যদি কোনো শিক্ষার্থী ইন্টারভিউতে সঠিকভাবে ইংরেজি প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারেন, তবে ভিসা অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে আবেদনটি বাতিল করে দিতে পারেন।
আপনি যদি কোনো কারণে আইইএলটিএস পরীক্ষা দিতে না চান, তবে বিকল্প হিসেবে পিটিই একাডেমিক কিংবা ডুওলিঙ্গো ইংলিশ টেস্ট দিতে পারেন। ইউরোপের বহু বিশ্ববিদ্যালয় এখন এই পরীক্ষাগুলোর স্কোর সানন্দে গ্রহণ করছে, যা আইইএলটিএসের তুলনায় কিছুটা সহজ এবং সাশ্রয়ী। কোনো এজেন্সির চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে হুট করে আবেদন করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। আইইএলটিএস ছাড়া ইউরোপে পড়াশোনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট এবং ওই দেশের ভিসা নির্দেশিকা নিজে ভালো করে যাচাই করে নেওয়া উচিত।
সাধারণত ইতালি, জার্মানি, হাঙ্গেরি এবং ফ্রান্সের কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আইইএলটিএস ছাড়া শর্তসাপেক্ষে আবেদন করা যায়। এক্ষেত্রে পূর্ববর্তী শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি হওয়া (MOI সার্টিফিকেট) অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্টে পাস করা বাধ্যতামূলক।
এমওই দিয়ে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে সেনজেনভুক্ত দেশের ভিসা সম্পূর্ণ নির্ভর করে দূতাবাসের ইন্টারভিউ এবং আপনার আর্থিক সক্ষমতার কাগজপত্রের ওপর। ইন্টারভিউতে ইংরেজি দক্ষতা প্রমাণ করতে না পারলে ভিসা রিফিউজ হতে পারে।
বর্তমানে ডুওলিঙ্গো ইংলিশ টেস্ট (DET) এবং পিটিই (PTE) উচ্চশিক্ষার জন্য দারুণ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইউরোপের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখন এই টেস্টগুলোর স্কোর গ্রহণ করছে এবং এগুলোর প্রস্তুতি নেওয়া আইইএলটিএসের চেয়ে কিছুটা সহজ।











